আমার গল্পসমগ্র: "অব্যক্ত ভালোবাসা"

“এই যে, আগামীকাল রাত ১২টায় আপনার ফাঁসি। আপনার কোনো শেষ ইচ্ছা থাকলে বলতে পারেন...।”
“আমি আমার বাসার বারান্দায় একটিবারের জন্য যেতে চাই।” কিছুটা হতাশায় ভরা মন নিয়ে কথাটা বলল আবির।
.
কিছুসময় পর ৪জন কনস্টেবল ও থানার ওসি আবিরকে নিয়ে গেলে তার সেই পুরনো বাসায়। আবিরের হাত, হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা। আস্তে আস্তে সে তার সেই চিরচেনা বারান্দায় আসলো। বারান্দাটার ঠিক সামনে আরেকটা ফ্ল্যাটের বারান্দা। আবির সেই বারান্দার দিকে এক পলকে তাকিয়ে আছে।
.
এইতো কিছুদিন আগে, ঐ ফ্ল্যাটে থাকতো আদিবা নামের এক অপূর্ব সুন্দরী। প্রতিদিনই মেয়েটি ঐ বারান্দায় আসতো। আর এদিকে আবির এই বারান্দায় বসে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো আদিবার দিকে। এক ইউনিভার্সিটিতেই পড়ালেখা করতো আবির ও আদিবা। কিন্তু কথা বলা তো দূরে থাক, একবারও ওরা মুখোমুখি পর্যন্ত হয় নি। আবির প্রতিদিনই বারান্দায় আসতো, আর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো আদিবার দিকে। আদিবা কোনোদিন বারান্দায় এসে ফোনে কথা বলতো। আবার কোনোদিন ইজি চেয়ারে বসে বই পড়তো। আবির শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো। এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে আবির,আদিবাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো, তা সে নিজেই বুঝতে পারে নি।
.
একদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে দূর থেকে আবির, আদিবাকে দেখতে পায়। আজ আদিবাকে অনেক সুন্দর লাগছে। নীল ড্রেস পড়েছে, হালকা মেইকাপও করেছে। হঠাৎ আদিবার সামনে এসে একটা গাড়ী থামলো। আবির কিছুদূর থেকে দ্দেখতে পেলো যে তার বন্ধু রাসেল গাড়ী থেকে নেমে আদিবাকে জড়িয়ে ধরেছে। আদিবাও তাকে জড়িয়ে ধরেছে। এই দৃশ্য দেখে আবিরের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আদিবা,রাসেলের গাড়ীতে উঠে চলে গেলো।এক ঝাঁক হতাশা বাসা বাধলো আবিরের মনে। আবিরের চোখ থেকে দু’ফোটা চোখের জল ঝরে পড়লো।
রাতে আবিরের ঘুম আসলো না। শুধু মনে হতে লাগলো আদিবার কথা।
.
হতাশায় ভরা মন নিয়ে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারান্দায় আসলো আবির। ঐ ফ্ল্যাটের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না। আদিবার ঘরের লাইটটা এখনো জ্বলছে। হঠাৎ ওর চোখে পড়লো আদিবার ঘরে রাসেল বসে আছে। রাসেল, আদিবাকে কী যেন বুঝাতে চাইছে। কিন্তু আদিবা শুধু না বোধক মাথা নাড়ছে। একটু পরে আদিবা কেঁদে উঠলো। রাসেল চলে গেলো। আদিবা বসে শুধু কাঁদছিল। আবির কিছুই বুঝলো না। সে মনে মনে ভাবলো নিশ্চয় দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে। একরাশ কষ্ট নিয়ে ঘুমোতে গেলো আবির।
.
সূর্যের মৃদ্যু আলোয় সকালে ঘুম ভাঙ্গলো আবিরের। অভ্যাস অনুযায়ী আদিবাকে দেখার জন্য বারান্দায় আসলো আবির। কিন্তু আজ আদিবা বারান্দায় আসলো না। কিছুটা কষ্ট বুকে নিয়ে ফিরে আসলো সে।
.
আজ চারদিন হয়ে গেলো, আদিবা বারান্দায় আসে না। এমনকি ভার্সিটিতেও আসে না। এক অজানা আশংকা দেখা দিলো আবিরের মনে। কোনো অঘটন ঘটেনি তো আদিবার??
আবির আর থাকতে পারলো না। ঐদিনই ও আদিবার বাসায় গেলো।
.
কলিং বেল বাজিয়েই চলছে আবির। কিন্তু আদিবা দরজা খুলছে না। তাই দরজায় Knock করলো। দরজা খুলে গেলো। ওহ, তাহলে দরজা খোলাই ছিলো। আদিবাকে কোথাও না দেখে আবির সাহস করে ওর (আদিবার) বেডরুমে চলে গেলো।
.
.
কিন্তু একি??!! আবির নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলো না। পারলো না চিৎকার করে কাঁদতে। শুধু নিস্তব্দ হয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো আবির। আদিবার হাত থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে। কষ্টের পরিমাণ এতোই বেশি অনুভূত হচ্ছিলো যে, আবির কাঁদতেও পারলো না। শুধু নির্বাক মূর্তির মতো আদিবার লাশের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো আবির।
.
.
পোস্টমোডেম রিপোর্ট থেকে জানা গেলো, Adiba was pregnent........
.
আবির অনেক কষ্টে আদিবার ডায়রী খুঁজে পেলো। একেবারে শেষের লেখাটা ছিলো এরকম,
“রাসেল আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। ও আমাকে নয়, আমার শরীরকে ভালোবেসেছিলো। যখন আমি ওকে বললাম যে, আমি ওর সন্তানের মা হতে চলেছি, ও আমাকে প্রত্যাখ্যান করলো। আমাকে Abortion করতে বলল। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে নষ্ট করতে চাই না। আমি জানি না যা, আমি কি ঠিক করছি না কি ভূল...? কিন্তু আমি এটা জানি যে আমার পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব না। তাই চলে গেলাম.........”
.
.
আবিরে গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়লো। তার মধ্যে অন্যরকম একটা জেদ তৈরি হলো। মনে মনে বলল,“ওই নরপশুকে শাস্তি দিতেই হবে। আইন নয়, আমিই ওকে শাস্তি দেবো।”
.
.
হ্যাঁ, রাসেলকে, শাস্তি আবিরই দিয়েছিলো। গুনে গুনে ৪০ টা কোপ মেরেছিলো রাসেলের গায়ে। নির্মমভাবে হত্যা করেছে ওকে। পড়ে অবশ্য নিজে নিজেই আত্মসমর্পণ করেছিলো আইনের কাছে।
.
.
হঠাৎ কাঁধে, হাতের স্পর্শ পেয়ে বাস্তবে ফিরলো আবির। দু’ফোটা চোখের জল দেখা গেলো ওর চোখের কোণে।
আবির আর দাঁড়ালো না, পা বাড়ালো অজানা এক দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। হয়তো, ঐপারে গিয়ে বলতে পারবে যে, “আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আদিবা...”
আদিবা তখন মুচকি হেঁসে বলবে,“আগে কেন বললে না...? আমিও তোমায় অনেক ভালোবাসি,আবির।”

0 Comment "আমার গল্পসমগ্র: "অব্যক্ত ভালোবাসা""

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন